ঢাকার কোনো কারখানার মালিককে জিজ্ঞেস করে দেখুন, বাজারে তাঁর পণ্যের নকল বেরোলে আসল ক্ষতিটা তাঁর কোথায় হয়। তিনি কিন্তু কোনো হারানো মুনাফার খতিয়ান দেবেন না। তিনি শোনাবেন একটি ফোন কলের গল্প। কোনো ফার্মাসিস্ট, ডিস্ট্রিবিউটর বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাঁকে জানিয়েছেন যে, তাঁর ব্র্যান্ডের মোড়কে এমন এক পণ্য বাজারে ঘুরছে, যার ধারেকাছেও তিনি কোনোদিন ছিলেন না। অথচ এখন প্রমাণের পুরো দায়ভার এসে চেপেছে তাঁরই কাঁধে, আর তা-ও জালিয়াতরা তাদের কাজ সেরে হাওয়া হয়ে যাওয়ার বহু দিন পর। এই প্রক্রিয়ায় মালিকের যে নিছক অর্থ খোয়া যায়, বিষয়টা তা না। যা খোয়া যায় তা হলো, তাঁর কর্তৃত্ব বা অথরিটি। এই পণ্যটি আমার কিন্তু অমুক পণ্য আমার নয়, আধুনিক জালিয়াতরা মালিকের এই বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করার স্বরটি কেড়ে নেয়।
অথরিটি। এই একটি শব্দই হলো পুরো প্রোডাক্ট। কিউআর কোড, স্ক্যানার বা ড্যাশবোর্ড নেহাতই কিছু যন্ত্র। এদের একমাত্র কাজ ছিল প্রস্তুতকারকের প্রয়োজনীয় ওই একটিমাত্র বাক্যকে সুনিশ্চিত করা। কিন্তু গত এক দশক ধরে ইন্ডাস্ট্রি কেবল যন্ত্রই বেচে গেছে এবং আসল বাক্যটির গ্যারান্টি দেওয়ার বেলায় সন্তর্পণে এড়িয়ে গেছে।
ফাঁকিটা এখানেই যে, সে কেবল ‘হ্যাঁ’ বলতে জানে
আজকাল বেশিরভাগ পণ্য-যাচাই ব্যবস্থা ঠিক এভাবেই কাজ করে। প্যাকেটের গায়ে একটি কোড ছাপা থাকে, ক্রেতা স্ক্যান করেন। অতঃপর স্ক্রিনটি সবুজ হয়ে বলে ওঠে জেনুইন। কিন্তু ওই সবুজ স্ক্রিনটি আসলে কী যাচাই করছে তা জিজ্ঞেস করলেই গোঁজামিলটি ধরা পড়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই সিস্টেম কেবল কোডের বিন্যাস বা প্যাটার্নটি ঠিক আছে কি না এবং তা কোনো ওয়েবপেজে রিডাইরেক্ট করে কি না সেটুকু দেখে। অথচ ক্রেতার হাতের ওই নির্দিষ্ট মোড়কটি যে সত্যিই কারখানা থেকে বেরিয়েছে, তা সে চেক করে না। একজন জালিয়াত যখন একটি আসল প্যাকেটের ছবি তুলে সেই একই কোড নিজেদের দশ হাজার নকল পণ্যের গায়ে ছাপিয়ে দেয়, তখন সে দশ হাজারটি ‘সবুজ স্ক্রিন’ উপহার পায়। কারণ, সিস্টেমটাকে কখনোই তাকে ‘না’ বলার জন্য তৈরি করা হয়নি। তার কাজ ঢালাওভাবে সবাইকে ‘হ্যাঁ’ বলে যাওয়া, আর যে সিস্টেম সবাইকে কেবল ‘হ্যাঁ’ বলতে জানে, সে আসলে কিছুই যাচাই করে না। সে স্রেফ প্যাকেটের গায়ে ভেরিফিকেশনের একটি প্রসাধনিক প্রলেপ মাখিয়ে দেয়, যা কোনো সিস্টেম না থাকার চেয়েও ভয়ংকর। কারণ এটি ক্রেতাকে ঠিক সেই সিগন্যালটির ওপরই ভরসা করতে শেখায়, যা জালিয়াতরা হুবহু নকল করতে শিখে গেছে।
অ্যান্টি-কাউন্টারফিট বা নকল-প্রতিরোধক শিল্পে এর একটি নাম আছে, যা এখনো সেভাবে আমদানি হয়নি। সেলফ-সার্টিফিকেশন বা স্ব-প্রত্যয়ন নীরবে ব্যর্থ হয়। যে দাবি নিজেই নিজের পরীক্ষক, সে তো নিজেকে সবসময় পাস করাবেই। ভারত জাতীয় পর্যায়ে ঠিক এই ধাক্কাটিই খেয়েছিল। তাদের ফার্মাসিউটিক্যাল কিউআর কোডের ম্যান্ডেট কোনো চতুর জালিয়াতির কাছে হার মানেনি। হেরেছে সবচেয়ে স্থূল আক্রমণের কাছে। জালিয়াতরা স্রেফ আসল কোডগুলো কপি করে নকল ওষুধের গায়ে বসিয়ে দিয়েছিল। আর সেগুলো দিব্যি পাস করে গেছে। সিস্টেমের ভেতরে সন্দেহ ধরে রাখার কোনো উপায়ই ছিল না। সে শুধু ‘হ্যাঁ’ বলতে জানত।
যে পরিদর্শককে ‘আমি জানি না’ বলার অধিকার দেওয়া হয়েছে
একটি ব্রিজের নিরাপত্তা চেক করতে যাওয়া ইঞ্জিনিয়ারের হাতে কেবল নিরাপদ লেখা কোনো একক সিলমোহর থাকে না। তাঁর জাজমেন্ট হয় তিন ধরনের: নিখুঁত, ত্রুটিপূর্ণ এবং এখনো যাচাই করা হয়নি (যেটি সবচেয়ে বেশি অর্থবহ)। এই তৃতীয় ক্যাটাগরিটা হলো তাঁর যাচাইকরণের সত্য সীমারেখা। যে ইঞ্জিনিয়ার চেক না করা প্রতিটি জয়েন্টের গায়েও নিরাপদ সিল মেরে দেন, তিনি ভয়ংকর বিপদের কারণ হতে পারেন এবং কোনো সৎ ইঞ্জিনিয়ার এমন রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন না। যে মিটার শুধু পাস দেখায়, সেটি একটি নষ্ট মিটার। অথচ অথেন্টিকেশনের জগতে, যে রিডারটি সবসময় শুধু ‘জেনুইন’ দেখায়, তাকেই বিরাট ফিচার হিসেবে বিক্রি করা হয়।
প্রকৃত কার্যকর মডেল ইঞ্জিনিয়ারের শৃঙ্খলাকে দোকানের তাকে নিয়ে আসে। একটি যাচাই-যন্ত্রকে অবশ্যই সেই স্ট্যাটাসগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখতে হবে, যেগুলো আসলেই ম্যাটার করে: ভেরিফাইড—হ্যাঁ, এই ইউনিটটি কারখানার নিজস্ব উৎপাদন এবং এটি যেখানে থাকার কথা সেখানেই আছে। অজ্ঞাত—আমার কাছে এর কোনো রেকর্ড নেই এবং আমি অযথা জানার ভান করব না। সন্দেহজনক—এই আসল কোডটি অস্বাভাবিক আচরণ করছে, হয়তো এক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি ভিন্ন শহরে দৃশ্যমান হচ্ছে, অথবা যে আসল ইউনিটটি একবার স্ক্যান হওয়ার কথা, সেটি চারশো বার স্ক্যান হচ্ছে। বিকৃত—ডিজিটাল সিগনেচার বা প্রমাণ মিলছে না।
এর মধ্যে কেবল প্রথম স্ট্যাটাসটি সবাইকে খুশি করে। কিন্তু বাকি তিনটি স্ট্যাটাসই নকল ধরে ফেলে। যেখানে নকল প্রোডাক্টের বাসা, ঠিক সে জায়গায় একটি সৎ মেশিন বিনা প্রশ্নে কোনো কিছুকে ছাড়পত্র দিতে অস্বীকার করে। ‘সবুজ স্ক্রিন’ সন্দেহের ভাষাই ডিলিট করে রেখেছে, তাই সে কিছুই দেখতে পারে না। আর সৎ মেশিন নকল ধরে, কারণ সে সন্দেহের ভাষাটা জিইয়ে রাখে এবং ক্রেতা সবুজ সংকেত দেখতে চাইলেও, প্রয়োজনে তাঁর সামনে এটি ব্যবহার করার স্পর্ধা রাখে।
সন্দেহকে কখনোই নীরবে ‘পাস’ করানো যাবে না
একটি বিশ্বাসযোগ্য সিস্টেম এবং একটি লোক-দেখানো আলংকারিক সিস্টেমের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয় একটিমাত্র নিয়ম: সন্দেহকে কখনোই নীরবে প্রোমোশন দিয়ে ‘পাস’ করানো যায় না। যন্ত্র যখন কোনো ইউনিটের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারে না, তখন সে ক্রেতা, কারখানার মনিটরিং প্যানেল এবং রেকর্ড, সবাইকে তা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়। অজানা কোনো কিছুকে সম্ভবত ঠিক আছে বলে পাস করিয়ে দেওয়া তার কাজ নয়, কারণ এমনটি করলেই স্ক্রিন সবুজ রাখা যায়। যে মুহূর্তে কোনো সিস্টেম নীরবে নিজের অনিশ্চয়তাকে আপগ্রেড করে ফেলে, সে মূলত অতিরিক্ত কিছু ধাপ যুক্ত করে সেই স্ব-প্রত্যয়নকারী সবুজ স্ক্রিনটিকেই নতুন করে নির্মাণ করে।
প্রস্তুতকারক চাইলে এটি টেস্ট করে দেখতে পারেন। এমন একটি কোড স্ক্যান করুন যা কারখানা থেকে কখনোই ইস্যু করা হয়নি: সিস্টেমটি কি ‘রেকর্ড নেই’ বলে, নাকি আপনাকে আশ্বস্ত করার কোনো রাস্তা খোঁজে? এমন একটি আসল কোড স্ক্যান করুন যা ইতিমধ্যেই চার জেলায় তিনশো বার ব্যবহৃত হয়েছে: সে কি এই অসম্ভব ব্যাপারটি ধরতে পারে, নাকি আবারও হাসিমুখে ‘আসল’ বলে রায় দেয়? আলংকারিক সিস্টেম দুটোতেই পাস দিয়ে দেবে। আর সৎ সিস্টেমটি তার সীমারেখা ধরে রাখবে। এই সীমারেখা ধরে রাখার ক্ষমতাকে জালিয়াতরা একমাত্র ভয় পায়। আপস্ট্রিমের ক্ষেত্রে, এই একই শৃঙ্খলা আগাম সতর্কবার্তায় পরিণত হয়: ওই অসম্ভব-ভ্রমণ প্যাটার্ন এবং অতিরিক্ত-স্ক্যান হওয়া কোডটি ফোন কল আসার বহু আগেই নকলের উপস্থিতি জানান দেয়। কিন্তু এটি কেবল তখনই সম্ভব, যখন সিস্টেমটি অসংগতিকে গায়েব করে দেওয়ার বদলে সন্দেহকে রেকর্ড করার সাহস রাখে।
সততার সীমারেখা
উপরিউক্ত কোনোটিই জালিয়াতের জীবনকে পুরোপুরি অসম্ভব করে তোলে না। বরঞ্চ যে আপনাকে এই অসম্ভব করার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাকে আপনার অবিশ্বাস করা উচিত। এরূপ প্রতিশ্রুতি বরং ভণ্ডামির সবচেয়ে বড় লক্ষণ। তিনটি সীমারেখা স্পষ্টভাবে বলা যাক। কোনো ডিজিটাল যাচাই-ব্যবস্থা সেই ক্রেতাকে রক্ষা করতে পারবে না যিনি কখনোই স্ক্যান করেন না। এটি স্ক্যান-কালচারের সমস্যা। কোনো ভেন্ডরের একার পক্ষে এর সমাধান সম্ভব নয়। ফিজিক্যাল লেয়ার বা ভৌত স্তর জালিয়াতের খরচ বাড়ায় ঠিকই, কিন্তু তা কখনো অসীম পর্যায়ে নিতে পারে না। আবার কপি করা ইম্পসিবল এরূপ কথা নতুন পোশাকে ওই সবুজ স্ক্রিনের আরেক মিথ্যা নিশ্চয়তা। শৃঙ্খলা একটি ডিজাইন ফিলোসফি, কোনো কেনা পণ্য নয়। ক্রেতাদের খুশি রাখার চাপে পড়ে, সৎ অবস্থা ধরে রাখার জন্য, নির্মিত সিস্টেমকে নীরবে কনফিগারেশন পাল্টে অকার্যকর করে দেওয়া যায়। যখন কেউ ক্রমাগত এমন কোড স্ক্যান করে যায় যেগুলোর ফেইল করার কথা এবং যাচাই করে দেখে যে সিস্টেমটির এখনো ফেইল করানোর মেরুদণ্ড আছে কি না, তখন এই নিয়ম টিকে থাকে।
মডেল যা পুনরুদ্ধার করে তা তথাকথিত ফুলপ্রুফ বা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চেয়েও সুনির্দিষ্ট এবং টেকসই। সে প্রস্তুতকারকের অথরিটি ফিরিয়ে দেয়, যার মাধ্যমে তিনি বলতে পারেন এই পণ্যটি আমার এবং ওই পণ্যটি সম্পর্কে আমি এখনো জানি না। আলংকারিক সিস্টেমগুলো ঐ দ্বিতীয় বাক্যটি শোনার অভ্যাস পুরো বাজার থেকে ভুলিয়ে দিয়েছে। যে ভেরিফিকেশন সিস্টেম কখনোই ফেইল করতে পারে না, সে আসলে ব্র্যান্ডকে রক্ষা করছে না; সে বরং গ্যারান্টি দিচ্ছে যে জালিয়াতের বানানো নকল পণ্যগুলো সে নির্বিঘ্নে পাস করিয়ে দেবে। এভাবেই সে জালিয়াতকে রক্ষা করছে। আপনাকে কেউ কোনো সিস্টেম বিক্রি করতে এলে তাকে কতবার সে সিস্টেম জেনুইন বলে, প্রথম প্রশ্ন এটি করবেন না। বরং তাকে জিজ্ঞাসা করুন, যেদিন ‘না’ বলার কারণে কারো একটি বিক্রি বাতিল হয়ে যাবে, সেদিনও কি তার ‘না’ বলার স্পর্ধা থাকবে?